৭০ বছরেও স্বীকৃতি পাননি চাঁদপুরের ৪০ ভাষা সংগ্রামী

৭০ বছরেও স্বীকৃতি পাননি চাঁদপুরের ৪০ ভাষা সংগ্রামী

৭০ বছরেও স্বীকৃতি পাননি চাঁদপুরের ৪০ ভাষা সংগ্রামী

ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ ৭০ বছর পেরিয়ে গেলেও চাঁদপুরের ৪০ ভাষা সংগ্রামীর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আজও মেলেনি। ২০২০ সালে একটি রিট আবেদনে সারা দেশের ভাষা সংগ্রামীদের মুক্তিযোদ্ধাদের মতো তালিকা তৈরি এবং ভাতাদি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। এরপর দুই বছর কেটে গেলেও হয়নি সেই তালিকা। এই ৪০ ভাষা সংগ্রামীদের মধ্যে এখন আর কেউই বেঁচে নেই। জীবিত থাকা অবস্থায়ও ভাষা আন্দোলনের জন্য এসব সংগ্রামীদের কপালে জোটেনি রাষ্ট্রীয় কোনও সম্মান। তবে ইতিহাসের পাতায় এই সংগ্রামীদের পরিচয় তুলে ধরতে  মহান এ কর্মের স্বীকৃতি চান স্বজনরা।

বিভিন্ন তথ্যসূত্র ও পরিবারের সদস্যদের হিসাব মতে, জেলায় ৪০ জন ভাষা সংগ্রামীর নাম পাওয়া গেছে। তারা হলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের প্রথম নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির বাবা এমএ ওয়াদুদ পাটোয়ারী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক চাঁদপুর মহকুমা যুবলীগের সাবেক সভাপতি এএফএম ফজলুল হক, ডা. মজিবুর রহমান চৌধুরী, মহকুমা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম চৌধুরী টুনু, সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা ও সাবেক এমপি আবদুর রব, সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আবদুল আউয়াল, আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সাবেক সংসদ সদস্য আইনজীবী সিরাজুল ইসলাম, সাবেক গণপরিষদ সদস্য ও চাঁদপুর পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল করিম পাটোয়ারী, রফিক উদ্দিন আখন্দ ওরফে সোনা আখন্দ, বি এম কলিম উল্লাহ, মোল্লাহ ছিদ্দিকুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক অ্যাডভোকেট আবু জাফর মো. মাইনুদ্দিন, অ্যাডভোকেট আবুল ফজল, হোমিও চিকিৎসক এ বি খান, আবদুল করিম খান, সুজাত আলী মুন্সী, তৎকালীন তরুণ সংগঠক শাহ আমান উল্লাহ মানিক, সাবেক এমপি নওজোয়ান ওয়ালিউল্লাহ, আইনজীবী শেখ মতিউর রহমান, ডা. এম এ গফুর, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সাবেক এমপি ফ্লা. লে. (অব.) এ বি সিদ্দিক, মেজর জেনারেল (অব.), ডা. এম শামসুল হক, সাবেক এমপি হারুনুর রশিদ খান, হাফেজ হাবিবুর রহমান, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজাফ্ফর আলী, সাবেক পৌর চেয়ারম্যান নুরুল হক বাচ্চু মিয়াজী, তৎকালীন চাঁদপুর মহকুমা ছাত্রলীগ নেতা আবুল কালাম আজাদ, ডা. আবদুস ছাত্তার, কবি শামছুল হক মোল্লা, আইয়ুব আলী খান, কর্নেল (অব.) ডা. আহমেদ ফজলুল মতিন, লে. কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল মমিন খান মাখন, অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, ডা. মতিউর রহমান, আবু নাছের মো. ওয়াহিদ, জয়নুল আবেদীন, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক কমর উদ্দিন চৌধুরী এবং নারী সংগঠক সাবেক এমপি আমেনা বেগম।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ঢাকাসহ প্রতিটি জেলায় মায়ের ভাষা ‘বাংলা’র জন্য প্রবল আন্দোলন-সংগ্রাম হয়। সারা দেশের মতো চাঁদপুরেও গড়ে ওঠে ‘রাষ্ট্রভাষা বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদ চাঁদপুর মহকুমা ইউনিট’। এই ইউনিটের নেতৃত্বে চাঁদপুরের অনেক কৃতী সন্তান মায়ের ভাষার জন্য লড়েছিলেন।

১৯৫২ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি তৎকালীন চাঁদপুর মহকুমা শহরে অবস্থিত আহম্মদিয়া মুসলিম হোস্টেলে (বর্তমানে চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজ হোস্টেল) গোপনে এক গুরুত্বপূর্ণ সভা হয়েছিল। ওই সভায় ‘রাষ্ট্রভাষা বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদ চাঁদপুর মহকুমা ইউনিট’ গঠিত হয়। উপস্থিত সর্বসম্মতিক্রমে ইউনিটের সভাপতি মনোনীত হন তৎকালীন ঢাকা জগন্নাথ কলেজের ছাত্রনেতা আবদুর রব এবং কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্রনেতা চাঁদপুর সদর উপজেলাধীন রাড়িরচর গ্রামের মোল্লা ছিদ্দিকুর রহমান সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন। মহকুমা ইউনিট গঠনের সভায় যোগ দিয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন ভাষা সংগ্রামীসহ অনেকে। পরে তারা তৎকালীন ‘রাষ্ট্রভাষা

রাষ্ট্রভাষা বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদ চাঁদপুর মহকুমা ইউনিট’র প্রতিনিধি হিসেবে চাঁদপুরের বিভিন্ন থানায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। চাঁদপুরের তৎকালীন ছয় থানা থেকে তারা এসে এই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগদান করে আন্দোলনকে গতিশীল করে তুঙ্গে অবতীর্ণ করেছিলেন। এই ৪০ জনের মধ্যে অনেকেই সে সময় ঢাকায় কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

জীবিত থাকা অবস্থায় ভাষা সংগ্রামী ডা. এম এ গফুর স্মরণ করে বলেছিলেন, ‘আমি তখন ঢাকা মেডিক্যালের এমবিবিএসের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ২১শে ফেব্রুয়ারির মিছিলে গাজীউল হক, আবদুল মতিন, অলি আহাদ, আতাউর রহমান খান, আবুল কাশেমের (অধ্যক্ষ আবুল কাশেম) ঠিক পেছনে ছিলাম। আমি রাজপথে দেখেছিলাম বুলেটবিদ্ধ রক্তে রঞ্জিত ভাষা শহীদদের শরীর। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রাবাসের বারান্দায় পড়ে থাকা বুলেটবিদ্ধ শফিউর রহমানকে বাঁচানোর জন্যে সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু ইতোমধ্যে তিনি শাহাদাতবরণ করেন।’

তিনি আরও বলেছিলেন, ‘ভাষা শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থাকা প্রয়োজন। না হয় প্রজন্ম একদিন গ্রামগঞ্জের ভাষাসৈনিকদের নামটাও ভুলে যাবে। সনদপত্রই সম্মান সৃষ্টি করে না। যথোপযুক্ত মর্যাদা থাকতে হবে ভাষাসৈনিকদের। কারণ, ভাষা দিবস পৃথিবীর এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। যা এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত।’

ভাষা সংগ্রামী শেখ মোজাফ্ফর আলীর ছেলে শেখ মহিউদ্দিন রাসেল বলেন, ‘এত বছর পরেও চাঁদপুরের এই ভাষা সংগ্রামীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পাওয়া কষ্টের। আমার বাবা মৃত্যুর আগে শয্যাশায়ী থাকা অবস্থায়ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু তিনি তা পাননি। আমার বাবা ভাষার জন্য আন্দোলন ও কাজ করেছেন। তখন কিন্তু তারা এই স্বীকৃতির জন্য আন্দোলন করেননি। মাতৃভাষার জন্য কাজ করেছেন, সেটিই বড় কথা।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই সরকার তাদের তালিকাভুক্ত করুক। আশা করি, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও পাবেন।’

ভাষা সংগ্রামী কমর উদ্দিন চৌধুরীর ছেলে কেন্দ্রীয় কৃষক লীগ নেতা সারওয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী বলেন, ‘বাবা ১৯৪৯ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনে সচিবালয় গেটে মারাত্মক আহত হয়েছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকও ছিলেন। ভাষা সংগ্রামীর ছেলে হিসেবে গর্ববোধ করি। কিন্তু এই সৈনিকদের আজও মূল্যায়ন করা হয়নি, যা অত্যন্ত জরুরি। মুক্তিযোদ্ধাদের মতো ভাতাদি না হোক, সনদ, সম্মান এবং তাদের পরিচয়গুলো তুলে ধরা হোক। এতে প্রজন্ম উপকৃত হবে। ইতিহাস বিকৃত হবে না।’

প্রসঙ্গত, মুক্তিযোদ্ধাদের মতো ভাষা শহীদ ও ভাষাসৈনিকদের রাষ্ট্রীয় সম্মান, সম্মানী ভাতা, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং তাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশের নির্দেশনা চেয়ে ২০২০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ৮ মার্চ ছয় মাসের মধ্যে ভাষা শহীদ ও ভাষাসৈনিকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

পাঠকের মন্তব্য