চাঁদপুরবাসীর কাছের মানুষ দীপু মনি ——— দৈনিক জনকন্ঠ

চাঁদপুরবাসীর কাছের মানুষ দীপু মনি ——— দৈনিক জনকন্ঠ

চাঁদপুরবাসীর কাছের মানুষ দীপু মনি ——— দৈনিক জনকন্ঠ

রাজনীতিতে আপনি কীভাবে এলেন?

দীপু মনি : আসলে রাজনীতিতে আমার আসা হয়নি, রাজনীতির মধ্যেই আমি জন্মেছি। কারণ বাবা রাজনৈতিক ছিলেন আর বাংলাদেশের একটা খুব উত্তাল সময়ে আমার জন্ম, মধ্য ষাটের দশকে এবং যখন আমি একটু একটু বুঝতে শিখেছি, যখন থেকে আমার স্মৃতি আছে সেই সময়টা হচ্ছে আমাদের গণঅভ্যুথানের সময়। ওই সময়টাতে আমাদের বাড়িতে পারার ছেলেরা, রাজনৈতিক কর্মীরা সব কীভাবে পোস্টার লিখছে, ফ্যাস্টুন লিখছে, সমস্ত লোকের আনাগোনা, সারাক্ষণ রাজনৈতিক আলোচনা এর মধ্যে দিয়েই বড় হয়েছি। ছোটবেলা থেকেই বলতাম বড় হয়ে রাজনীতিবিধ হব। কাজেই সে অর্থে আমি রাজনীতিতে আসিনি, রাজনীতির মধ্যেই বড় হয়েছি।
আপনার বাবা একজন ভাষাবীর ছিলেন, ওনার সম্পর্কে কিছু বলেন

 
দীপু মনি : আমার বাবা ভাষাবীর এমএ ওয়াদুদ। তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা একজন মানুষ। ছোটবেলা থেকেই তিনি নানা জায়গায় গিয়ে জায়গির থেকে পড়াশোনা করেছেন যদিও আমাদের বাড়িতে আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল কিন্তু তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা। তিনি খুব ভাল ছাত্র ছিলেন। মাদ্রাসায়ও পড়েছেন। তখনকার দিনে ম্যাট্রিকে প্রথম বিভাগ পাওয়া চাট্টিখানি কথা ছিল না। তিনি ম্যাট্রিকে প্রথম বিভাগ পেয়েছেন। ঢাকা কলেজ থেকে আইয়ে পরীক্ষা দিয়েও প্রথম বিভাগ পেয়েছেন। সেখান থেকে ভর্তি হন ঢাকা ভার্সিটিতে। ঢাকা কলেজে থাকাকালীন তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। বঙ্গবন্ধু এবং হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর সহচর ছিলেন। ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন। তিনি ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য। ’৫০-এর দশকে জেল খেটেছেন। বাংলাদেশের মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন, অধিকার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু একটি শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক অসন্তোষ বন্ধ করার জন্য দুটি কারখানা পরিচালনার দায়িত্ব দেন, সেই চাকরিটাও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তখন বলে ছিলেন এটাও দলের একটা কাজ। পরবর্তীতে তিনি দায়িত্ব নেন। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তাকে ওএসডি করে রাখা হয়। বারং বার মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলেও রাখা হয়। জিয়াউর রহমান তাকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ করলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। অবশেষে আমাদের কাঁদিয়ে ১৯৮২ সালে তিনি পরপারে চলে যান।

 
নারী হয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন?
দীপু মনি : আমি মনে করি নারীদের শুধু রাজনীতিতে নয় সব ক্ষেত্রেই প্রতিবন্ধকতার সমানে পড়তে হয়। আমি মনে করি নারীদের প্রথম প্রতিবন্ধকতাটা আসে নিজের ভেতর থেকে। কারণ আমরা জন্মের পর থেকে আমরা যে সামাজিক পরিবেশের মধ্যে দিয়ে বড় হই সেখানে আমাদের শেখানো হয়, এটা করবে না, ওটা করবে না! মেয়েরা এটা করে না, সেটা করে না নানা কথা। আমাদের চারপাশেই শুধু না, না, না শুনতে হয়। এতে করে আমাদের মনের চারপাশে একটা দেয়াল তৈরি হয়ে যায়। সেই দেয়াল থেকে ভেঙ্গে বের হওয়াই প্রথম যুদ্ধ। আমি মনে করি সে দেয়াল ভেঙ্গে যে মেয়ে বের হতে পারে তাকে আর দমিয়ে রাখা যায় না। আমার সামনে অবশ্য তেমন কোন প্রতিবন্ধকতাই আসেনি। বলতে পারেন আমার বাবার সুনামের কারণে এবং আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অশেষ ¯েœহধন্য হওয়ার কারণেই তেমন কোন প্রতিবন্ধকতা ফেস করতে হয়নি। তবে কিছূ প্রতিযোগিতা তো থাকবেই। এত কোটি মানুষের দেশ, সেখানে আওয়ামী লীগের মতো একটি দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে, যেখানে মাত্র ৮৭ জন সদস্য, মহান সংসদে ৩৫০টি আসন। প্রতিযোগিতা থাকলেও কথনই প্রতিহিংসার শিকার হইনি।
নারীর এগিয়ে যাওয়া নিয়ে আপনার ভাবনা?
দীপু মনি : দেখুন বাংলাদেশের প্রতিটা ক্ষেত্রেই নারীরা এখন এগিয়ে যাচ্ছে। একটা সময় ছিল ধরেন শিক্ষকতা, বলা হতো যে ঠিক আছে মেয়েরা শিক্ষকতা করতে পারবে, চিকিৎসক হওয়ার ক্ষেত্রেও ঠিক ছিল। কিন্তু বাকি পেশাগুলোতে ধরেন নার্সিং পেশাটিকে সাধারণ মেয়েরা যেতে চাইত না। মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত ঘরের মেয়েরা তো মোটেও নয়। নি¤œবিত্ত ঘরের মেয়েরা নার্সিংয়ে যেত। পেশাটিকে সম্মানের চোখে দেখা হতো না। কিন্তু এ পেশাটিকে এখন সম্মানের চোখে দেখা হয়। অনেকেই এখন নার্সিং পেশাটিকে বেছে নিচ্ছে। আর এ সবই শেখ হাসিনার অবদান। কোথায় নারী নেই বলেন, আমরা সশস্ত্র বাহিনীতে নারী দেখছি, বৈমানিক, পাইলট, ফাইটার পাইলট, সর্বোচ্চ আদালত, রাষ্ট্রদূত, সচিব, এসপি, ডিসি, ইউএনও, কোথায় নারী নেই বলেন? সবখানেই নারীর জয়জয়কার এবং এই অগ্রযাত্রার উৎস হচ্ছেন শেখ হাসিনা। কারণ আপনি ভেবে দেখুন ’৯৬ সালের পূর্বে নারীর এমন জয়জয়কার ছিল না এবং ’৯৬ সালে যখন প্রথম শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হলেন তার পরে ৯৭ সালে নারী উন্নয়ন নীতিমালা করলেন। তার মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শতকরা ৩৩ ভাগ আসন নারীদের জন্য বরাদ্দ করলেন তিনি। রাতারাতি আমরা সাড়ে বার হাজার নারী নির্বাচিত স্থানীয় পর্যায়ে পেয়ে গেলাম এবং তার হাত ধরেই প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী নারী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নারী, স্পীকার নারী, কৃষিমন্ত্রী নারী পেয়েছি আমরা। এক কথায় বলতে হয়, নারীরা এখন আর পিছিয়ে নেই। তাকে আর আটকে রাখা যাবে না।
আপনি যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন, বিদেশে কীভাবে বাংলাদেশকে ফুটিয়ে তুলেছেন?

 
দীপু মনি : পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কাজ দেশের বাইরেই। আর এজন্য আমাকে বিশে^র অনেক দেশেই যেতে হয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এবং ৭৫ পরবর্তী ২১ বছরে বাংলাদেশের যে দুর্নাম হয়েছিল সারাবিশে^, বাংলাদেশকে একটি দরদ্রি, হতদরিদ্র দেশ হিসেবে বিশে^ পরিচিত করেছিল। এ ছাড়া সাংবাদিক নির্যাতন, নারী নির্যাতন, জঙ্গীবাদ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের দেশ হিসাবে পরিচিত করেছিল সেই পরিচিতিকে দূর করে গণতান্ত্রিক,অসাম্প্রদায়িক দেশ হিসেবে বিশে^র দরবারে তুলে ধরার জন্য চেষ্টা করেছি।বিশে^র মানুষের কাছে প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরেছি।আর এর প্রয়াস ছিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর।আমার প্রতিটি সফর মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর অনুমোদিত।দেশের ভাবমূর্তি বিশে^ তুলে ধরতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে পরিকল্পনা ছিল তা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। এখন বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি অনেক উপড়ে।
বঙ্গবন্ধু পরবর্তী নারীর ক্ষমতায়ন
দীপু মনি : আসলে বঙ্গবন্ধু পরবর্তী বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন তেমনটা ছিল না। ’৯৬ সালে যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসেন তখন থেকেই নারীর ক্ষমতায়ন শুরু হয় বাংলার মাটিতে। আর বর্তমানে তো দেখছেনই নারীরা এগিয়ে চলছে দুর্বার গতিতে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নারী, স্পীকার নারী, অনেক মন্ত্রী নারী, সংসদ সদস্য নারী। বিচার বিভাগেও নারী। সুতরাং বলতেই হয় যে শেখ হাসিনার সময়ই নারীর ক্ষমতায়নটা বেশি দেখছি আমরা।
চাঁদপুরের নারী নিয়ে ভাবনা
দীপু মনি : শুধু চাঁদপুরের নয় আমি সারা বাংলাদেশের নারী নিয়েই চিন্তা করি। প্রতিটি মানুষই সম্ভাবনা নিয়ে জন্মায়। এবার হোক সে নারী কিংবা পুরুষ, দরিদ্র কিংবা বিত্তবান। আসলে সমাজ এখনও কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীকে পিছিয়ে রাখতে চায়। তবে সেটা খুবই নগণ্য। তবে আমি বিশ্বাস করি আমাদের চাঁদপুরের নারীরা সব ক্ষেত্রে এগিয়ে যাবে। সাক্ষরতার ক্ষেত্রেও এখন চাঁদপুরের নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি দেখুন চাঁদপুরে নারী শিক্ষার হার ও বাড়ছে। চাঁদপুরের সাংস্কৃতিক জগতেও নারীরা দেখলাম বেশ এগিয়ে। চাঁদপুরের অনেক মেয়েই বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ছেন, ভাল চাকরি করছেন বড় বড় স্থানে আছেন। এটা সত্যি ভাবতে খুব ভাল লাগছে। আপনি জানেন লেখালেখি, সাংবাদিকতা জগতের সেই উজ্জ্বল নক্ষত্র, বেগম পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগমের বাড়িও চাঁদপুর। তো তাঁরা যদি পারে এখন কার নারীরা পারবে না কেন? চাঁদপুরের মেয়েরা আগেও পেরেছে এখনও পারবে।
চাঁদপুরের উন্নয়ন কর্মকা- নিয়ে বলুন
দীপু মনি : সারাদেশের মতো চাঁদপুরেও ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। আপনি জানেন মেঘনার ভাঙ্গনকবলিত চাঁদপুরের যে পরিচিতি ছিল সেটা এখন আর নেই। আল্লাহর রহমতে ভাঙ্গন কমেছে। বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। চাঁদপুরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন হয়েছে। মেরিন একাডেমি, পাসপোর্ট অফিস, বিদ্যুত কেন্দ্র একটি আছে আরেকটির নির্মাণ কাজ চলছে, আরও একটা হবে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে। মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি ও শুরু হয়ে গিয়েছে। রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। এমন অসংখ্য ছোট-বড় উন্নয়নের ছোঁয়া চাঁদপুরে লেগেছে। নৌবন্দর হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যটন এড়িয়া হিসেবে চাঁদপুরকে গড়ে তোলা হচ্ছে।
চাঁদপুরে আগামীর পরিকল্পনা
দীপু মনি : চাঁদপুরের আরও কয়েকটা জিনিস করার ইচ্ছা আছে। চাঁদপুরে অনেক খাল রয়েছে। কোথাও কোথাও সেগুলো দখল হয়েছে, নষ্ট হয়েছে এগুলো হলো বিদ্যাবতীর খাল, এসবি খালসহ বেশ কিছু খাল। আমি চাই সেগুলোকে দখল মুক্ত করে হাতিরঝিলের আদলে গড়ে তুলতে। আমার মনে হয় এর জন্যই চাঁদপুরে অনেক পর্যটকের মিলনমেলা ঘটবে। এতে করে চাঁদপুরে অনেক পর্যটকের আনাগোনা হবে। চাঁদপুরের পর্যটনে ব্যাপক উন্নতি করবে। আর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চাঁদপুরে বড় কিছু করার একটা ইচ্ছা আছে আমার। আর চাঁদপুরে খুব শীঘ্রই একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় হবে। পাঠাগাড়ের কথা আপনি বলেছেন সেটাও হবে ইনশাআল্লাহ। এ ছাড়া আমি একটি ভ্রাম্যমাণ পাঠাগাড় করব। আর একটি ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল করারও ইচ্ছা আছে।
বাল্যবিয়ে বন্ধে পরিকল্পনা সম্পর্কে বলুন
দীপু মনি : দেখুন বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চেষ্টায় আমাদের দেশে বাল্যবিয়ের মাত্রা কমে এসেছে। এখন অভিভাবকরা অনেকটাই সচেতন। আমরাও চেষ্টা করছি বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করতে। এক সময় দেখবেন আমাদের দেশে আর বাল্যবিয়ের মতো ঘটনা ঘটবে না।
আপনার রতœগর্ভা মাকে নিয়ে কিছু বলুন
দীপু মনি : সন্তানের কাছে প্রতিটি মা-ই অনন্যা। আমার কাছেও আমার মা অনন্যা। জানেন উনি কখনও বিলাসীতা করতেন না। খুব সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। ব্যক্তি জীবনে কোন চাওয়া-পাওয়া ছিল না। আমার মা আমার কারণে রতœগর্ভা এমনটা নয়। ভাই একজন এই উপমহাদেশে ডায়াবেটিস সার্জারিতে একমাত্র বিশেষজ্ঞ সল্য চিকিৎসক। এ ছাড়া তিনি রাজনীতিতেও জড়িত। আমার মায়ের মধ্যে কখনই পরশ্রীকাতরতা ছিল না। কারও কিছু দেখলে যে এটা আমার পেতে হবে এমন কোন লোভ ছিল না। অন্যের সাফল্য দেখে ঈর্ষাণিত হতেন না, বরং খুশি হতেন। আমরা মায়ের কাছ থেকে সে বিদ্যাটাই শিখেছি।
আপনাকে ধন্যবাদ
দীপু মনি : জনকণ্ঠকেও ধন্যবাদ। জনকণ্ঠ জনগণের কথা বলে। আমি জনকণ্ঠের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।
2018

পাঠকের মন্তব্য