ইসলামে মানবসেবা ও মানবাধিকার - পর্বঃ ০২

ইসলামে মানবসেবা ও মানবাধিকার - পর্বঃ ০২

ইসলামে মানবসেবা ও মানবাধিকার - পর্বঃ ০২

সেবাঃ

সেবা হচ্ছে পরার্থে পরিশ্রম, বান্দার প্রতি বান্দার হক, মানুষের প্রতি মানুষের হক আদায় করা, সৃষ্টি জগতের প্রতি মানুষের কর্তব্যপালন। প্রকৃত মুসলিম হতে হলে আল্লাহ্র হক তথা আল্লাহ্র প্রতি মানুষের কর্তব্য সম্পাদন করা। মানুষে মানুষে পারস্পরিক দায়িত্ব-কর্তব্য যথাযথভাবে আদায় করা। মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্যকে সেবা বলা হয়। ব্যাপক অর্থে মানুষ সহ সকল সৃষ্টি জীবের প্রতি মানুষের দায়িত্ব-কর্তব্য এবং দয়া প্রদর্শনকে সেবা বলা হয়। নিজের করণীয় বিবেচনায় মানুষের প্রতি এবং অন্য সৃষ্টির প্রতি দায়িত্ব পালন করা। তাদের প্রাপ্য অধিকার আদায় করা। তাদের প্রতি নিজের করণীয় যথাযথভাবে সম্পাদন করা।

ইসলামে সেবার গুরুত্বঃ

ইসলামের দৃষ্টিতে সেবার গুরুত্ব অপরিসীম। সবাই দায়িত্বশীল। সেবার মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করা হয়। দায়িত্ব দু’প্রকার, একটি হচ্ছে হক্কুল্লাহ বা আল্লাহ্র হক আর অন্যটি হল হক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক। প্রত্যেক মুসলমানকে আল্লাহ্র প্রতি কর্তব্য সমূহ বা আল্লাহ্র হক এবং বান্দার প্রতি হকসমূহ বা সৃষ্টির প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করতে হয়। ইসলাম সেবা ও পারস্পরিক দায়িত্বপালনে বিষয়টি তিনটি মৌলিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ ও উপস্থাপন করে এবং এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে। এগুলো হচ্ছে,

১- ) সৃষ্টি জগতের প্রতি দায়িত্ববোধ

২- ) মানবজাতির প্রতি দায়িত্ববোধ

৩- ) মুসলিমদের প্রতি দায়িত্ববোধ

১- ) সৃষ্টি জগতের প্রতি দায়িত্ববোধঃ

খেদমতে খাল্ক বা সৃষ্টির সেবা ইসলামের এক মৌলিক অঙ্গ। ইসলামের দৃষ্টিতে সমগ্র সৃষ্টি জগৎ হচ্ছে এক আল্লাহ্র পরিবার সদৃশ। ইসলাম পরস্পরের সম্পর্ক বিষয়ে একটি সুন্দর ধারণা পেশ করেছে যার চেয়ে উচ্চতর ধারণা কল্পনা করা যায়না। একটি পরিবারের সদস্যরা যেমন পরস্পর নির্ভরশীল, সহযোগী ও সহানুভূতিশীল তেমনিই সমগ্র সৃষ্টি জগতকেও পরস্পরে সহযোগী ও সহানুভূতিশীল হতে হবে। সমগ্র সৃষ্টি জগৎ এক আল্লাহ্র পরিবারভুক্ত বলে এক জাগতিক ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে মানুষের মধ্যে এক গভীর সহানুভূতি, সদাচার ও ভ্রাতৃত্বের ভাবধারা সৃষ্টি হয়। বায়হাকি শরিফে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন,

‘সব সৃষ্টি আল্লাহতায়ালার পরিবার তুল্য। যে যত বেশি সৃষ্টির সেবা করবে সে তত বেশি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করবে।’

এতে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, আল্লাহ্র পরিবারের সদস্য হিসেবে প্রত্যেক সৃষ্টি আমাদের সাহায্য সহায়তা ও সদাচার পাওয়ার অধিকারী। আল্লাহ্র প্রিয় বান্দা হতে হলে এবং আল্লাহ্কে পেতে হলে সৃষ্টির সেবার কোন বিকল্প নেই কারণ যে আল্লাহ্র সৃষ্টির সেবক হয় সে আল্লাহ্র নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয়।

মানুষের তথা জীবজগতের এমনকি জড়জগতেরও ভারসাম্য রক্ষায় একমাত্র মোক্ষম প্রক্রিয়াই হলো মিথ্যা, অন্যায়, হিংসা-বিদ্বেষ পরের অহিত দূর করে সর্বতোভাবে জনহিত কর কাজে আত্মনিয়োগ করা। “ভোগে নয়, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ” এ আদর্শ সামনে রেখে “মানুষ সে পর হোক তবু সে যে আপনারই ভাই” এই ধারণায় উৎসাহিত হতে হবে। “নাই কিরে সুখ, নাই কিরে সুখ, এই জীবন কি শুধু বিষাদময়” বলে নিরস্ত হয়ে বসে থাকলে চলবে না। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে গতিই জীবন গতিহীন তাই মৃত্যু। এজন্যে কবি বলেন,

পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি

এ জীবন মন সকলি দাও,

তার মত সুখ কোথাও কি আছে?

আপনার কথা ভুলিয়া যাও।

পরের কারণে মরণেও সুখ,

‘সুখ-সুখ’ করি কেঁদো না আর;

যতই কাঁদিবে যতই ভাবিবে,

ততই বাড়িবে হৃদয়-ভার।

আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে

আসে নাই কেহ অবনী পরে

সকলের তরে সকলে আমরা

প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।

আত্মসুখে নয়, পরের কল্যাণে নিয়োজিত জীবনই সত্যিকার মানব জীবন- এ বিশ্বাসে উজ্জেবিত জীবনই সঠিক জীবন। তাই বলা হয়েছে সৃষ্টিকে যে ভালবাসেনা সে আল্লাহ্কে ভালবাসেনা। কবি বিবেকানন্দ বলেছেন,

জীবে দয়া করে যেই জন,

সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।

সৃষ্টির সেবা ছাড়া নেই কোন ধর্ম।

-এস, এ, এম, মিজানুর রহমান খান প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি- চাঁদপুর সমাজ উন্নয়ন সংস্থা

 

পাঠকের মন্তব্য