মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর চোখে শিক্ষকের মর্যাদা : সৈয়দ মোঃ গোলাম ফারুক

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর চোখে শিক্ষকের মর্যাদা : সৈয়দ মোঃ গোলাম ফারুক

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর চোখে শিক্ষকের মর্যাদা : সৈয়দ মোঃ গোলাম ফারুক

সম্প্রতি আমাদের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি এম পি শিক্ষা সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছেন। শিক্ষকের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি না পেলে “গুনগত শিক্ষা” অর্জিত হবে না। টেকসই উন্নয়নের যে চার নম্বর লক্ষ্যটি শিক্ষার সংগে সম্পর্কিত তার তিনটি উপাদানের একটি হচ্ছে এই “গুনগত শিক্ষা” যা ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জন করব বলে আমরা প্রতিজ্ঞা করেছি। সেই লক্ষ্যে সরকার নতুন কারিকুলাম তৈরি করছে, এখন পাইলটিং চলছে, সামনের বছর থেকে সেটা বাস্তবায়ন শুরু হবে। এরকম একটা সময়ে মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রীর এই কথাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। 

শিক্ষায় যখনই একটা বড় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়, তখনই এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ধকলটা পোয়াতে হয় শিক্ষকদের। তাঁরা কোন একটা বিষয় কোন এক ভাবে পড়াতে পড়াতে যখন অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন তখনই একদিন হঠাত করে বলা হয় যে তাঁদেরকে কোন নতুন বিষয় নতুন ভাবে পড়াতে হবে বা মূল্যায়ন করতে হবে। হঠাত করে বলছি এই কারনে যে প্রায়শ দেখা যায় শিক্ষকদের প্রস্তুত না করেই তাঁদেরকে নতুন একটা বিষয় নতুন একটা পদ্ধতিতে পড়াতে কিংবা মূল্যায়ন করতে বলা হয়। এতে দুটো সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমত তাঁরা ধন্ধে পড়ে যান; এবং দ্বিতীয়ত এর জন্য যে বাড়তি পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়, মর্যাদাহীনতায় ভোগার কারনে সেই বাড়তি পরিশ্রম করার কোন উদ্দীপনা তাঁদের মধ্যে তৈরি হয় না।

এরকম ঘটনা যে আমাদের দেশে ঘটেছে তার অন্তত তিনটি উদাহারন দেওয়া যাক। ১৯৮৭-র দিকে মাধ্যমিক পর্যায়ের ইংরেজি শিক্ষায় কমিউনিকেটিভ এপ্রোচ বলে একেবারে নতুন একটি শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং তার সংগে নতুন টেক্সটবই সংযোজন করা হয়। ২০১০ সালে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে চালু হয় সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি। ২০১২ সালে আসে নতুন কারিকুলাম এবং তার সংগে নতুন টেক্সটবই। এই তিনটির কোনোটিতেই আশানুরূপ সাফল্য আসে নি। কমিউনিকেটিভ এপ্রোচ চালু করে সঠিক ভাবে বাস্তবায়ন করা গেল না বলে, কাগজে কলমে থাকলেও, পরে তা একপ্রকার উঠে গেল। একইভাবে, ২০১২ সালের কারিকুলামের কিছু বিষয় যেমন ফরমেটিভ এসেসমেন্ট বা ধারাবাহিক মূল্যায়ন সত্যিকার অর্থে চালু করা যায় নি। আর সৃজনশীল প্রশ্নপত্র যে অনেক শিক্ষকরা এই এগারো বছরেও বুঝে উঠতে পারেন নি এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় বহু বার লেখা লেখি হয়েছে। 

শিক্ষকরা কেন এগুলো বাস্তবায়ন করলেন না বা করতে পারলেন না তার মূখ্য যে তিনটি কারন আছে তার সবগুলোই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে তাঁদের মর্যাদার সংগে জড়িত। প্রথমটি মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয় যে আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদার কথা বলেছেন সেটি। অর্থাৎ তাঁদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা যথেষ্ট নয় বলে তাঁরা বাড়তি পরিশ্রম করে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার কোন উতসাহ বোধ করেন নি। দ্বিতীয় কারনটিও  সরাসরি তাঁদের মর্যাদার সংগে সম্পর্কিত। উপরে উল্লিখিত তিনটি বিষয় যখন সংযোজন করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়, তখন শিক্ষা-বাস্তবতা সম্পর্কে সবচাইতে যাঁরা ভাল জানেন সেই শিক্ষকদের মতামত বা পরামর্শ নেওয়া হয় নি। এভাবে তাঁদের এড়িয়ে যাওয়ায় অন্তত দুটো সমস্যা দেখা দিয়েছিল। কারিকুলাম প্রণেতাদেরকে বাস্তব অবস্থা থেকে একটু দূরে থেকেই তাঁদের কাজটি করতে হয়েছিল এবং অবহেলিত ও বঞ্চিত বোধ করেছিলেন বলে শিক্ষকরাও এর বাস্তবায়নে তেমন উৎসাহ বোধ করেন নি। তৃতীয়ত, নতুন একটা বিষয় নতুন ভাবে পড়ানোর জন্য যে প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার প্রয়োজন ছিল সেটাও দায়সারা ভাবে দেওয়া হয়েছিল বলে শিক্ষকদের কাছে ঐ অচেনা-অজানা সংযোজনগুলো তেমন গুরুত্ব পায় নি।

শিক্ষকের মর্যাদার সংগে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িত যে তিনটি বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হল সেগুলোর দিকে নজর না দিলে বাংলাদেশের শিক্ষায় কোন সংযোজন যে সফল হবে না, তা বুদ্ধি দিয়ে না হলেও অভিজ্ঞতা দিয়ে আমরা বুঝে গেছি। এ কারনেই মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী চমৎকার ভাবে এই সত্যটি উচ্চারন করেছেন। তিনি যে কেবল কথার কথা বলেছেন তাই নয়। তিনি ইতিমধ্যে কিছু ব্যবস্থাও নিয়েছেন। আমি ওপরে যে তিনটি বিষয়ের কথা বললাম, তার অন্তত শেষ  দুটির দিকে যে তিনি তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন, সেটা এখন স্পষ্ট। যেমন ২০২৩ সালে কারিকুলাম বাস্তবায়নের আগে এবছর যে পাইলটিং হচ্ছে, এরকম আগে কখনও হয় নি। অর্থাৎ কারিকুলাম প্রনয়ন করার সময় শিক্ষকরা আগে কখনও এভাবে যুক্ত হন নি। এবার শিক্ষকরা নিজেরা এই নতুন কারিকুলাম সম্পর্কে তাদের মতামত সরাসরি সরকারকে জানাতে পারবেন, তাদের নিজেদের সুবিধা-অসুবিধার কথা বলতে পারবেন, তাদের স্কুলের সীমাবদ্ধতার বিষয়টা স্পষ্ট করতে পারবেন, নতুন কারিকুলামের জন্য শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা কতটা তৈরি সে সম্পর্কে মতামত দিতে পারবেন, এবং এই কারিকুলাম আসলে কতটা বাস্তবায়ন করা যাবে তার একটা ধারনা দিতে পারবেন। সর্বোপরি, গুনগত, অন্তর্ভুক্তিমূলক, ও জীবনব্যাপী শিক্ষা অর্জনে এই কারিকুলাম কতটা সহায়ক হবে সেটা তাদের কাছ থেকেই সবচেয়ে ভাল ভাবে জানা যাবে।

শুধু তাই নয়, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এবার শিক্ষকদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন যেটা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে এবং এবছরের শেষ নাগাদ অর্থাৎ নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের আগেই মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষক এই প্রশিক্ষণ পেয়ে যাবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। এছাড়াও, এই কারিকুলাম বাস্তবায়ন করার জন্য যে ক্ষেত্র প্রস্তুত করা প্রয়োজন, করোনার মধ্যেই তার অনেকটা তিনি প্রস্তুত করে ফেলেছেন। নতুন কারিকুলামে প্রকল্প ভিত্তিক অভিজ্ঞতামূলক শিখন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিখন-শেখানো পদ্ধতি হবে যার কার্যকারিতা পরীক্ষা-নীরিক্ষার জন্য মাউশি ইতিমধ্যে সারাদেশে দুটো প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে—"বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধকে জানি” এবং “মুজিববর্ষে গাছ রোপন পরিবেশের সংরক্ষণ”। এই দুটো প্রকল্পই দৃশ্যমান ভাবে সফল হয়েছে। সারা দেশে সপ্তম শ্রেনীর শিক্ষার্থীরা বংগবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ওপর প্রায় এক লাখ ডকুমেন্টারি তৈরি করে ফেলেছে এবং প্রায় এক লাখ রিপোর্ট লিখেছে। আর ষষ্ঠ শ্রেনীর শিক্ষার্থীরা শুধু ঐ প্রকল্পের আওতায় নিজেদের চেষ্টায়, নিজেদের পছন্দ মত, নিজেদের পরিচর্যায়, এবং নিজেদের জায়গায় প্রায় ২৫ লাখ গাছ লাগিয়েছে। নতুন কারিকুলামে কমিউনিটি সার্ভিসের কথা আছে। শিক্ষকরা পাশে থাকলে শিক্ষার্থীরা যে এই কাজ উৎসাহের সংগে করতে পারে এর প্রমানও পাওয়া গেছে। করোনার সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডাকে সাড়া দিয়ে হাওড় অঞ্চলে প্রায় দশ হাজার একর জমিতে তারা বোরো ধান কেটে দিয়েছে।

নতুন কারিকুলামে শিখন-শেখানোর ক্ষেত্রে আরও যে দুটো বিষয় গুরুত্ব পাবে সেগুলো হচ্ছে দূরশিক্ষণ ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন। এই দুটো বিষয়েও শিক্ষকরা ইতিমধ্যে বহুদূর এগিয়ে গেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই টিভি ক্লাস ও অনলাইন ক্লাসে পারঙ্গম হয়ে উঠেছেন। প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এসাইনমেন্ট বিস্ময়কর অবদান রেখেছে। গবেষণায় দেখা গেছে শিখন-শেখানো ও মূল্যায়ন উভয় ক্ষেত্রে এসাইনমেন্ট অত্যন্ত কার্যকর ছিল। এবং নতুন কারিকুলামের যেটা অন্যতম লক্ষ্য—স্ব-শিক্ষা—সেই লক্ষ্য অর্জনেও এসাইনমেন্ট একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে। নতুন কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য গুরুত্ব পাবে বলে ইতিমধ্যে প্রায় এক লাখ শিক্ষককে পুষ্টি বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, এখন প্রায় দু লাখ শিক্ষককে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ চলছে, এবং প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে স্বাস্থ্যসম্মত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার কাজও বহুদূর এগিয়ে গেছে। নিয়মিত ভাবে শিক্ষার্থীদের বি এম আই মাপার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে। মেয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য রক্ষায় সারা দেশে সাত কোটি আয়রন ফলিক এসিড  সরবরাহ করে তা খাওয়ানোর কাজ শুরু হয়েছে।

অর্থাৎ মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এতদিন যা করেছেন তা প্রমান করে যে তিনি যা বলেছেন সত্যিই সত্যিই তিনি তা বিশ্বাস করেন এবং শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য তিনি নিশ্চিতভাবেই সচেষ্ট থাকবেন। তবে এটা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহলের খুব বড় একটা সিদ্ধান্তের বিষয়। এখানে শিক্ষকদেরও একটা বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। আসন্ন কারিকুলামটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করে তাঁদের প্রমান করতে হবে যে, যে মর্যাদা মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী তাঁদের দিতে চান তা পাওয়ার যোগ্যতা তাঁরা রাখেন।  

লেখকঃ মাউশির সাবেক মহাপরিচালক, অধ্যাপক, ও ফলিত ভাষাতত্ত্ববিদ

পাঠকের মন্তব্য